এম. এ. আলিম খান: 13 September 2026 , 6:16:22 প্রিন্ট সংস্করণ
একটি নম্বর—হয়তো কারও কাছে খুব সামান্য। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর কাছে সেই একটি নম্বরই কখনো হয়ে উঠতে পারে স্বপ্নপূরণের সিঁড়ি, আবার কখনো স্বপ্নভঙ্গের কারণ। একটি গ্রেডের পার্থক্য বদলে দিতে পারে পছন্দের কলেজে ভর্তির সুযোগ, উচ্চশিক্ষার পথ কিংবা পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। তাই পরীক্ষার ফলাফল শুধু কিছু সংখ্যা বা অক্ষরের সমষ্টি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, পরিবারের আশা এবং বহু বছরের পরিশ্রম। এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কোনো শিক্ষার্থী যখন প্রত্যাশিত ফল পায় না, তখন তার সামনে পুনঃনিরীক্ষার সুযোগটি হয়ে ওঠে নতুন আশার দরজা। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষা ও পুনঃমূল্যায়নের ফলাফল যেন সেই আশারই প্রতিচ্ছবি। কারও গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে, কারও নম্বর বেড়েছে, কেউ পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫, আবার কেউ অকৃতকার্য থেকে নতুন করে কৃতকার্য হয়ে ফিরে পেয়েছে স্বপ্ন দেখার সাহস।
গত ১০ সেপ্টেম্বর দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষা ও পুনঃমূল্যায়নের ফল প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত মূল ফলাফলে উত্তীর্ণ হয়েছিল ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। অর্থাৎ পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। কিন্তু ফল প্রকাশের পরও অনেক শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন ছিল—তার খাতা কি সঠিকভাবে মূল্যায়ন হয়েছে? কোনো উত্তর কি বাদ গেছে? নম্বর যোগে কি ভুল হয়েছে? প্রত্যাশিত গ্রেড না পাওয়ার পেছনে কি কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল রয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পুনঃনিরীক্ষার আবেদন করে।
প্রায় ২২ শতাংশ শিক্ষার্থীর নতুন প্রত্যাশা
পুনঃনিরীক্ষা ও পুনঃমূল্যায়নের জন্য আবেদন করেছে প্রায় ৪ লাখ ২ হাজার ৫২ জন শিক্ষার্থী, যা মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ২২ শতাংশ। সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে বড়। এর অর্থ, ফল প্রকাশের পর দেশের প্রায় প্রতি পাঁচজন শিক্ষার্থীর একজন তার ফলাফল পুনরায় যাচাইয়ের সুযোগ নিয়েছে। সবচেয়ে বেশি আবেদন করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা। এ বোর্ডে আবেদনকারীর সংখ্যা ৯৪ হাজার ২৩৬ জন, যা মোট আবেদনের ২৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে কম আবেদন করেছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা। এ বোর্ডে ১৭ হাজার ২৮৩ জন শিক্ষার্থী পুনঃনিরীক্ষার আবেদন করেছে, যা মোট আবেদনের প্রায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৮টি খাতা পুনঃনিরীক্ষা ও পুনঃমূল্যায়ন করা হয়েছে। এরপর প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ফলাফল বদলে গেছে।
অকৃতকার্য থেকে কৃতকার্য—নতুন করে শুরু
পুনঃনিরীক্ষার ফলাফলের সবচেয়ে আনন্দের দিক হলো—অনেক শিক্ষার্থী, যারা মূল ফলাফলে অকৃতকার্য হয়েছিল, তারা নতুন করে কৃতকার্য হয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী পুনঃনিরীক্ষার মাধ্যমে অকৃতকার্য থেকে কৃতকার্য হয়েছে। এই তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড। সেখানে ১ হাজার ১৮০ জন শিক্ষার্থী নতুন করে কৃতকার্য হয়েছে, যা মোট নতুন কৃতকার্যের প্রায় ২৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে নতুন করে পাস করেছে ৮৬৭ জন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৬৬৪ জন, যশোরে ৩৮০ জন, ঢাকায় ৩৩৭ জন এবং কুমিল্লায় ৩৩৬ জন। এ ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ২৫৫ জন, চট্টগ্রামে ১৯০ জন, সিলেটে ১৮৬ জন, রাজশাহীতে ১১১ জন এবং বরিশালে ৭৯ জন শিক্ষার্থী পুনঃনিরীক্ষার পর নতুন করে কৃতকার্য হয়েছে। একজন শিক্ষার্থীর জন্য এই সংখ্যা হয়তো শুধু একটি পরিসংখ্যান। কিন্তু তার পরিবার জানে, এই ‘পাস’ শব্দটির মূল্য কতটা। ফল প্রকাশের দিন যে ঘরে নেমে এসেছিল হতাশা, সেখানে হয়তো পুনঃনিরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ফিরে এসেছে আনন্দ। যে শিক্ষার্থী নিজেকে ব্যর্থ মনে করছিল, সে আবারও নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ পেয়েছে।
গ্রেড পরিবর্তনে ঢাকা শীর্ষে
পুনঃনিরীক্ষার ফলে শুধু অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হয়নি। অনেক শিক্ষার্থীর গ্রেডও পরিবর্তিত হয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ২৭ হাজার ৮৩৬ জন শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেই গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ৮ হাজার ৯৯৯ জনের। যা মোট গ্রেড পরিবর্তনের ৩২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ৬৩১ জন শিক্ষার্থীর, যা মোটের ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। গ্রেডের এই পরিবর্তন অনেক শিক্ষার্থীর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি গ্রেডের পার্থক্য কখনো কখনো ভর্তির প্রতিযোগিতায় একজন শিক্ষার্থীকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে দিতে পারে।
নম্বর পরিবর্তনেও ঢাকা এগিয়ে
পুনঃনিরীক্ষা ও পুনঃমূল্যায়নের ফলে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ৫৬ হাজার ২৫৯ জন শিক্ষার্থীর নম্বর পরিবর্তন হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে। ঢাকার ২১ হাজার ৬৯ জন শিক্ষার্থীর নম্বর পরিবর্তন হয়েছে, যা মোট নম্বর পরিবর্তনের ৩৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। সবচেয়ে কম নম্বর পরিবর্তন হয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে—১ হাজার ১৭২ জন, যা মোটের ২ দশমিক ০৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সামান্য একটি ভুলও একজন শিক্ষার্থীর ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
জিপিএ-৫-এর নতুন আনন্দ
এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অনেক শিক্ষার্থীর বহুদিনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন যখন প্রথম ফলাফলে পূরণ হয় না, তখন পুনঃনিরীক্ষা অনেকের জন্য হয়ে ওঠে শেষ আশার জায়গা। ২০২৬ সালের পুনঃনিরীক্ষার ফলে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে নতুন করে মোট ৩ হাজার ৭৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এ তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডের ৯০৬ জন শিক্ষার্থী নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা মোট নতুন জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ২৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। তবে খুব কাছাকাছি রয়েছে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড। সেখানে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৭৭ জন শিক্ষার্থী। এ ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ২৯৩ জন, দিনাজপুরে ২৭৫ জন, কুমিল্লায় ২০৭ জন, যশোরে ১৮২ জন, সিলেটে ১২১ জন, বরিশালে ১১২ জন, চট্টগ্রামে ৮৩ জন এবং রাজশাহীতে ৭৭ জন নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে নতুন জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৬ জন।
পুনঃনিরীক্ষা শুধু ফল বদলায় না, বদলায় মানসিকতাও
একজন শিক্ষার্থীর জন্য পরীক্ষার ফলাফল জীবনের শেষ কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে পরীক্ষার ফলাফলকে অনেক সময় শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে অনেক শিক্ষার্থী গভীর হতাশায় পড়ে যায়।সেখানেই পুনঃনিরীক্ষার গুরুত্ব। এটি শুধু কয়েকটি নম্বর সংশোধনের প্রক্রিয়া নয়; এটি একজন শিক্ষার্থীকে তার ফলাফল পুনরায় যাচাইয়ের ন্যায্য সুযোগ দেয়। এবারের ফলাফলে ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী নতুন করে পাস করেছে, ৩ হাজার ৭৯ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে, ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে এবং ৫৬ হাজার ২৫৯ জনের নম্বর পরিবর্তন হয়েছে। এই সংখ্যাগুলোর প্রতিটিই একেকটি পরিবারের গল্প। কেউ হয়তো নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কেউ হয়তো পছন্দের কলেজে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কেউ আবার পরিবারের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর নতুন সাহস ফিরে পেয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়
পুনঃনিরীক্ষার মাধ্যমে যখন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর নম্বর ও গ্রেড পরিবর্তিত হয়, তখন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও ভাবতে হবে। পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করেন মানুষ। তাই মানবিক ভুলের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে কীভাবে মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা যায়, তা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে। কারণ একজন শিক্ষার্থীর কাছে একটি নম্বরও তুচ্ছ নয়।
শেষ কথা
২০২৬ সালের এসএসসি পুনঃনিরীক্ষার ফলাফল আমাদের সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। গ্রেড পরিবর্তন, নম্বর পরিবর্তন ও নতুন করে জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এগিয়ে। অন্যদিকে অকৃতকার্য থেকে নতুন করে কৃতকার্য হওয়ার ক্ষেত্রে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড সবার ওপরে। কিন্তু পরিসংখ্যানের বাইরেও এই ফলাফলের একটি মানবিক গল্প আছে। সেটি হলো—সুযোগ পেলে একজন শিক্ষার্থী আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
যে শিক্ষার্থী ফল প্রকাশের দিন হতাশ হয়ে পড়েছিল, সে পুনঃনিরীক্ষার পর নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারে। যে পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল, তাদের ঘরে ফিরতে পারে স্বস্তি। যে শিক্ষার্থী মনে করেছিল একটি ভুলের কারণে তার পথ বন্ধ হয়ে গেছে, সে আবারও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি ফলাফল কোনো শিক্ষার্থীর পুরো জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে না। একটি ভুল সংশোধনের সুযোগ কখনো কখনো শুধু একটি নম্বর ফিরিয়ে দেয় না—ফিরিয়ে দেয় আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের পথচলার সাহস।
লেখক: সহকারী কান্ট্রি ডিরেক্টর, ভাব বাংলাদেশ

















