সারাদেশ

আধুনিক শিক্ষার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলছে সামছুন্নাহার মোহাম্মদীয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা

  শাকিল আহমেদ জামালপুর প্রতিনিধি 16 August 2026 , 10:17:41 প্রিন্ট সংস্করণ

নারী শিক্ষার প্রসার, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে নৈতিক ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলছে জামালপুর সদর উপজেলার ৯ নম্বর রানাগাছা ইউনিয়নের বীর গোবিন্দবাড়ী এলাকার সামছুন্নাহার মোহাম্মদীয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা। ১৯৯৩ সালের ১৮ জুলাই প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা ড. রুহুল আমিন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুন্স বার্ক ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর মা সামছুন্নাহারের নামে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন তাঁর ছোট ভাই আলহাজ্ব মহিউদ্দিন আহমেদ মান্নু মিয়া।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোঃ লুৎফর রহমান (কামিল/২য়)। মাদ্রাসাটিতে ইবতেদায়ী প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ১১৬ জন এবং ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ১২০ জনসহ মোট ২৩৬ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। তাদের পাঠদানে রয়েছেন ১৫ জন শিক্ষক। এছাড়া একজন অফিস সহায়ক, একজন গেটম্যান ও একজন নৈশপ্রহরী দায়িত্ব পালন করছেন।
ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞানের চর্চা
প্রতিষ্ঠানটিতে বাংলা, ইংরেজি, আরবি ও সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কুরআন-হাদিস ও ইসলামী শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক শিক্ষার সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম লক্ষ্য।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাঠদানের পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের।
খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম
শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য রয়েছে খেলার মাঠ। জাতীয় দিবসগুলো যথাযথভাবে পালন করা হয়। রয়েছে স্কাউট কার্যক্রমও। ক্রীড়া, কুরআন তিলাওয়াত, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা ও প্রতিভা বিকাশে উৎসাহিত করা হয়।
এছাড়া বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও মানবিক কাজে সম্পৃক্ত করা হয়। বন্যাসহ বিভিন্ন দুর্যোগের সময় ত্রাণ ও মানবিক কার্যক্রমেও প্রতিষ্ঠানটির অংশগ্রহণ রয়েছে।
দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে মাদ্রাসা
দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ রয়েছে। অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বৃত্তির ব্যবস্থা নেই। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাবেক শিক্ষার্থীদের সাফল্য
প্রতিষ্ঠানটির সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিভিন্ন পেশায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁদের মধ্যে মোছাঃ মৌসুমি আক্তার অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী নার্সিং পেশায় যুক্ত হয়ে মানুষের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।
এছাড়া আকলিমা খাতুন কৈডোলা শাহবাজ মাদ্রাসায় মৌলভি শিক্ষক এবং জাকির হোসেন রানাগাছা দাখিল মাদ্রাসায় মৌলভি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাবেক শিক্ষার্থীদের এমন সাফল্য প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমের ইতিবাচক দিক তুলে ধরছে।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতে গুরুত্ব
প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত অভিভাবক সভা এবং ফলাফল পর্যালোচনার মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানি থাকলেও নেই আধুনিক ল্যাব
মাদ্রাসাটিতে বর্তমানে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এখনো কিছু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম নেই। চালু হয়নি অনলাইন বা ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রমও। পাশাপাশি প্রয়োজন রয়েছে একটি আধুনিক একাডেমিক ভবনের। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষার সুযোগ থেকে শিক্ষার্থীরা এখনো পুরোপুরি সুবিধা নিতে পারছে না।
নতুন ভবন ও আধুনিক ল্যাবের প্রত্যাশা
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি নতুন ও আধুনিক একাডেমিক ভবন, বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব, ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আবাসিক সুবিধা চালু করা গেলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান আরও উন্নত হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগও সম্প্রসারিত হবে।
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ৩৩ বছরের পথচলায় সামছুন্নাহার মোহাম্মদীয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা আজ ২৩৬ জন শিক্ষার্থীর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি বিকাশে প্রতিষ্ঠানটির ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ইতোমধ্যে স্থানীয় শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা তৈরি করেছে।
প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে সামছুন্নাহার মোহাম্মদীয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা ভবিষ্যতে নারী শিক্ষার প্রসার ও মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে,এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।

আরও খবর

Sponsered content