বিশেষ প্রতিনিধি 11 October 2026 , 1:41:07 প্রিন্ট সংস্করণ
একপাশে দিগন্ত বিস্তৃত সোলার প্যানেলের সারি, তার ঠিক নিচেই সমান্তরালে সবুজ ফসলের খেত আর চরে বেড়ানো গবাদিপশু। উত্তরবঙ্গের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি আর ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদার অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটাতে চলেছে এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ। জমি অধিগ্রহণের কারণে কৃষকদের নিঃস্ব হওয়ার পুরোনো গল্প বদলে দিয়ে, সোলার প্যানেলের নিচে মালিকদের অধিকার ও চাষাবাদ বহাল রেখে উত্তরবঙ্গে এক নতুন টেকসই উন্নয়নের বার্তা নিয়ে আসছে লালমনিরহাটের ভোটমারী।
উত্তরবঙ্গের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও জাতীয় গ্রিডে পরিচ্ছন্ন শক্তি যুক্ত করার লক্ষ্যে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে ‘রংপুর সোলার পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড’ (RSPPL)। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী ইউনিয়নে ৩৫০ একর জমিতে ১০০ মেগাওয়াট (MW) ক্ষমতাসম্পন্ন একটি আধুনিক ‘এগ্রোভোল্টাইক সোলার পাওয়ার প্লান্ট’ স্থাপনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
প্রকল্পটির জমি নির্বাচন, চুক্তি সম্পাদন ও প্রকল্প এলাকার সরেজমিন পরিদর্শনের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্ধারিত স্থানে কোম্পানির প্রজেক্ট বোর্ডের পাশাপাশি ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ও প্রাথমিক কাজের জন্য বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কৃষি ও সৌরবিদ্যুতের অনন্য সমন্বয়: এগ্রোভোল্টাইক প্রযুক্তি
ঐতিহ্যগত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ধারণার বাইরে গিয়ে পরিবেশবান্ধব ‘এগ্রোভোল্টাইক’ (Agrivoltaic) প্রযুক্তির ওপর জোর দিয়েছে কোম্পানিটি। এই প্রযুক্তির ফলে জমি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সোলার প্যানেলের নিচে ও মধ্যবর্তী স্থানে একই সাথে আধুনিক কৃষিকাজ ও পশুপালন পরিচালিত হবে।
বিশেষ বিষয় হলো—জমির মূল মালিকরাই প্যানেলের নিচের অংশে চাষাবাদ অব্যাহত রাখবেন এবং উৎপাদিত শস্যের সুরক্ষায় কোম্পানির পক্ষ থেকে সব ধরনের আধুনিক প্রযুক্তিগত ও সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
রংপুর ও কুড়িগ্রামেও বিস্তৃত হচ্ছে মাস্টারপ্ল্যান
শুধুমাত্র লালমনিরহাটেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এই উদ্যোগ। উত্তরবঙ্গের জ্বালানি সংকট নিরসন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য রংপুর সোলার পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড তাদের পরিধি অন্যান্য জেলাতেও বিস্তৃত করছে।
রংপুর (গঙ্গাচড়া): গঙ্গাচড়া এলাকায় জমি পরিদর্শনের কাজ শেষ হয়েছে এবং স্থান নির্ধারণ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
কুড়িগ্রাম (চিলমারী ও কুড়িগ্রাম সদর): চিলমারী ও সদর উপজেলার আশপাশে একাধিক উপযুক্ত জমি নির্বাচন করা হয়েছে, যেখানে ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে আরও কয়েকটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইমরান আলি বলেন, “উত্তরবঙ্গ দীর্ঘকাল ধরে শিল্পায়ন ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। আমরা বিশ্বাস করি, লালমনিরহাটের ১০০ মেগাওয়াট এগ্রোভোল্টাইক সোলার প্রকল্প আমাদের সেই লক্ষ্য পূরণের প্রথম ধাপ। এই প্রকল্পের অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্য হলো—জমির মালিকরাই সোলার প্যানেলের নিচে নিজস্ব জমিতে চাষাবাদ করবেন এবং শস্য উৎপাদনে আমরা তাঁদের সহায়তা দেব। পাশাপাশি, জমিদাতা পরিবারের যোগ্য ও দক্ষ সদস্যদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরি দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।”
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার হিল্লোল বাউলিয়া বলেন, কারিগরি ও কৌশলগত সব দিক বিবেচনা করেই ভোটমারীতে ৩৫০ একর জমি নির্বাচন ও চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে। জমিদাতাদের স্বার্থ সর্বাগ্রে সংরক্ষণ করে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সকল কার্যক্রম শেষ করতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রকল্পটি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ভোটমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, “এই মেগা প্রকল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—জমির মালিকদের মালিকানা হারানোর কোনো ভয় নেই। নিজ জমিতেই তারা প্যানেলের নিচে চাষাবাদ করতে পারবেন এবং কোম্পানি থেকে সহযোগীতা পাবেন। এতে স্থানীয় তরুণেরা স্বাবলম্বী হবে। আমরা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি।”
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রামে রংপুরের এই মেগা সোলার প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদনে দেশের অর্থনীতিতে নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে।
প্রকল্প সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্যের জন্য RSPPL-এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করতে পারেন।

















