ঘুমের ওষুধ খাওয়া হোক বা বিছানায় শুয়ে ফোন স্ক্রল করা, আমরা নিজের অজান্তেই এমন কিছু করি, যা ঘুমকে দূরে ঠেলে দেয়। সুখবর হলো, এগুলোর বেশির ভাগই সহজে বদলানো যায়। সামান্য সচেতনতাই রাতের ঘুমকে করতে পারে গভীর ও প্রশান্ত।
ঘুমের আগে ক্যাফেইন নেওয়া অনেকের কাছে স্বাভাবিক অভ্যাস। কিন্তু কফি বা চা শরীরে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে চোখ বন্ধ করলেও মস্তিষ্ক বিশ্রামে যেতে চায় না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে অন্তত দুই ঘণ্টা পর ক্যাফেইন গ্রহণ করা ভালো। আর যাদের দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যা, তাদের কিছুদিন ক্যাফেইন একেবারে বাদ দিয়ে শরীরের পরিবর্তন লক্ষ্য করা উচিত।
অনেকেই রাতে ক্ষুধা লাগলে মিষ্টি বা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবারের দিকে হাত বাড়ান। কিন্তু এসব খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে আবার দ্রুত নামিয়ে আনে। তখন শরীর সতর্ক হয়ে যায়, অ্যাড্রেনালিন নিঃসরণ বাড়ে, ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমের আগে ক্ষুধা পেলে সামান্য প্রোটিনভিত্তিক খাবার শরীরকে বেশি আরাম দেয়।
অগোছালো শোবার ঘরও ঘুম নষ্টের বড় কারণ হতে পারে। ছড়িয়ে থাকা কাপড়, এলোমেলো জুতা কিংবা ভিড়ে ঠাসা পরিবেশ মনের ওপর অজান্তেই চাপ তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শোবার ঘর হওয়া উচিত শান্তির জায়গা। সেখানে শুধু ঘুম আর বিশ্রামের অনুভূতি থাকলেই মস্তিষ্ক দ্রুত শান্ত হয়।
অনেকেই অস্বস্তিকর বিছানায় ঘুমিয়ে অভ্যস্ত হয়ে যান। কিন্তু ভালো ম্যাট্রেস আর বালিশ ছাড়া গভীর ঘুম সম্ভব নয়। স্লিপ কোচ লরেন ফাউন্টেইনের মতে, খারাপ ম্যাট্রেসে ঘুমালে মাঝরাতে বারবার ঘুম ভাঙে এবং দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মনের ওপর প্রভাব পড়ে। নতুন ম্যাট্রেস কেনা সম্ভব না হলে অন্তত ভালো মানের টপার বা আরামদায়ক বালিশ ব্যবহার করাই ভালো।
ঘুমের আগে আলো কমানো ভীষণ জরুরি। মোবাইল, টিভি বা কম্পিউটার থেকে আসা নীল আলো ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনকে দমন করে। ফলে শরীর বুঝতেই পারে না যে এখন বিশ্রামের সময়। তাই শোবার ঘর যতটা সম্ভব অন্ধকার ও শান্ত রাখা ভালো।
ঘুমানোর আগে স্ক্রিনে সময় কাটানো আমাদের প্রায় সবারই অভ্যাস। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই অভ্যাস অনিদ্রার ঝুঁকি বাড়ায় এবং দিনের বেলায় ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয়। স্ক্রিন মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে, ঘুম আসতে দেরি হয়। তাই শোবার অন্তত আধা ঘণ্টা আগে ফোন বা টিভি থেকে দূরে থাকাই ভালো।
অনেক সময় ঘুম ভাঙে আশপাশের শব্দে। ঘড়ির টিকটিক, পাশের ঘরের টিভির আওয়াজ, পোষা প্রাণীর নড়াচড়া বা সঙ্গীর নাক ডাকা সব মিলিয়ে মস্তিষ্ক বিশ্রাম নিতে পারে না। শোবার আগে চারপাশের শব্দ কমানোর চেষ্টা করলে ঘুম অনেক গভীর হয়।
ঘুমের জন্য ঘরের তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলক ঠান্ডা পরিবেশে শরীর দ্রুত বিশ্রামে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ থেকে ৬৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা ঘুমের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। নিজের আর সঙ্গীর পছন্দ আলাদা হলে আলাদা ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
অনেকে ঘুমানোর ঠিক আগে ব্যায়াম করেন, ভাবেন এতে ক্লান্তি আসবে। কিন্তু ভারী ব্যায়াম শরীরে অ্যাড্রেনালিন বাড়িয়ে দেয়, যা ঘুম আসতে বাধা দেয়। তাই বিশেষজ্ঞরা ঘুমানোর অন্তত চার ঘণ্টা আগে ব্যায়াম শেষ করার পরামর্শ দেন।
শেষত, ঘুমের জন্য ওষুধের ওপর নির্ভরতা অনেক সময় সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। নিয়মিত ওষুধ খেলে শরীর সেটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। স্লিপ বিশেষজ্ঞ ড. লরেন্স এপস্টেইনের মতে, ওষুধ ছাড়া তখন ঘুম আসতে কষ্ট হয়। এর বদলে প্রাকৃতিক উপায় ও নিয়মিত রুটিন ঘুমকে স্বাভাবিক করে তুলতে সাহায্য করে।
সব মিলিয়ে, ভালো ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়, এটি শরীর ও মনের প্রয়োজন। ঘুমের আগে এই ছোট ছোট বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতে পারলে রাতের ঘুম হবে গভীর, আর সকাল শুরু হবে সতেজ ও প্রাণবন্ত অনুভূতি নিয়ে।
সূত্র জনকন্ঠ